শনিবার ২রা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৯শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম
শিরোনাম

প্রেম, দ্রোহের কবি হেলাল হাফিজ

এম.টি.আই স্বপন মাহমুদ   সোমবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০২৪
290 বার পঠিত
প্রেম, দ্রোহের কবি হেলাল হাফিজ

শুধু আমার চোঁখে নয় সাংবাদিকতা ও সাহিত্যে জগতে সবার কাছে এক অনন্য কবির নাম হেলাল হাফিজ। প্রেম, দ্রোহের কবি হেলাল হাফিজ মাত্র ৩টি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেই ১টিতে খ্যাতির তুঙ্গে স্থায়ী আসন গেড়েছেন। এই অনন্য উদাহরণ কেবলমাত্র বাংলা সাহিত্যেই নয়, হয়তো বিশ্বসাহিত্যও বিরল ঘটনা।

কবি হেলাল হাফিজ। তার পিতা খোরশেদ আলী তালুকদার ও মাতা কোকিলা বেগম। হাফিজের যখন তিন বছর বয়স, তখন তার মাতা মারা যান। জন্মেছিলেন ১৯৪৮ সালের ৭ অক্টোবর নেত্রকোনায়। তার ছেলেবেলা কেটেছে নেত্রকোনায়।


১৯৬৫ সালে নেত্রকোনার দত্ত হাইস্কুল থেকে এসএসসি, ১৯৬৭ সালে নেত্রকোনা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন তিনি। সেই বছরই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হন। শুরু হলো গ্রামীণ পটভূমি থেকে নাগরিক জীবনে পরিভ্রমণ এবং গড়ে তুললেন কবিতার এক অবাক বিশ্ব।

কবি হেলাল হাফিজ ছিলেন তীব্র রাজনীতি সচেতন। জীবনের অনেকগুলো বছর কাটিয়েছেন ঢাকার তোপখানা রোডের হোটেলে আর খেতেন নিয়মিতভাবে কাছেরই প্রেসক্লাবে।


বাংলা কবিতার প্রাঙ্গণে হেলাল হাফিজ এক বিস্ময়। কেন বিস্ময়? কবি মাত্রই চান প্রতিষ্ঠা, চান জনপ্রিয়তা, উপভোগ করেন পাঠক প্রিয়তাও। জীবনব্যাপী চর্চা করে, অনেক অনেক কাব্য রচনা করেও সেই কাঙ্খিত চুড়ায় পৌঁছতে পারেন না, সেই শূন্য পৃথিবীতে হেলাল হাফিজ মাত্র একটা কাব্যগ্রন্থ রচনা করেই খ্যাতির তুঙ্গে স্থায়ী আসন গেড়েছেন। এই অনন্য উদাহরণ কেবলমাত্র বাংলা সাহিত্যেই নয়, হয়তো বিশ্বসাহিত্যও বিরল ঘটনা।

‘যে জলে আগুন জ্বলে’ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮৬ সালে। কিন্তু কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের সতেরো বছর আগেই হেলাল হাফিজের ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতাটি বাঙালি পাঠকদের মনে দাগ কেটেছে। একটা জাতি, একটি কবিতার মধ্যে খুঁজে পেয়েছিল দিশা, আবিষ্কার করেছিল যৌবনের লালিত অগ্নিশিখা।


কবি একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “কবিতাটি কোনো পত্রিকা প্রকাশ করতে সাহস পায়নি।” আহমদ ছফা ও হুমায়ুন কবির কবিতাটির প্রথম দুটি ছত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে লিখে দিয়েছিলেন। তাৎক্ষণিক এই কবিতা নিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয় এবং এই ছত্র দুটি সেসময় রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত হয়।

পাড়ায়, মহল্লায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবৃত্তি মঞ্চে, বেতারে, টেলিভিশনে নানা কণ্ঠে, বিচিত্র অনুরাগে পাঠ চলেছে, আবৃত্তি চলেছে হেলাল হাফিজের কবিতা, নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়—

‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়
এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।
মিছিলের সব হাত
পা কণ্ঠ এক নয়
সেখানে সংসারী থাকে, সংসার বিবাগী থাকে,
কেউ আসে রাজপথে সাজাতে সংসার
কেউ আসে জ্বালিয়ে বা জ্বালাতে সংসার।
শাশ্বত শান্তির যারা তারাও যুদ্ধে আসে
অবশ্য আসতে হয় মাঝেমধ্যে
অস্তিত্বের প্রগাঢ় আহ্বানে,
কেউ আবার যুদ্ধবাজ হয়ে যায় মোহরের প্রিয় প্রলোভনে।
কোনো কোনো প্রেম আছে প্রেমিককে খুনি হতে হয়।
যদি কেউ ভালোবেসে খুনি হতে চান
তাই হয়ে যান
উৎকৃষ্ট সময় কিন্তু আজ বয়ে যায়
এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়
এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।’

প্রেম ও বিদ্রোহের কবি হেলাল হাফিজ কীভাবে ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতা লিখলেন, কেমন করে জ্বলে উঠেছিল সৃষ্টির স্রোতধারা—তারই পরিপ্রেক্ষিত জানিয়েছেন কবি নিজেই, অনেক সাক্ষাৎকারে।

তিনি বলেছেন—উনসত্তরের গণ অভ্যুত্থানের সময়ে এক সন্ধ্যায় আমি পুরোনো ঢাকা থেকে সার্জেন্ট জহুরুল হকে ফিরছিলাম। আমি তখন অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি। গুলিস্তানের ফুলবাড়িয়ায় আমায় বহন করা রিকশাটা থামলো। সেখানে তখন সামনে মিছিল চলছে। ইপিআর ও পুলিশ বাহিনী মিছিলকারীদের পেটাচ্ছে, ধাওয়া দিচ্ছে। মিছিল থেকেও ছোড়া হচ্ছে ইটপাটকেল।

এই সব ঘটনার মধ্যে এক রিকশাওয়ালা বলে উঠলো, মার শালাদের মার। প্রেমের জন্য কোনো কোনো সময়ে মার্ডারও করা যায়। রিকশাওয়ালারাও মাঝেমধ্যে টুকটাক ইংরেজি শব্দও টুকটাক বলে। কথাটা আমার মগজে গেঁথে গেল। আসলেও তো তাই। দেশপ্রেমের জন্যও তো মার্ডার করা যেতে পারে। ওই ঘটনা থেকে কবিতাটির জন্ম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকা সময়েই তিনি ১৯৭২ সালে দৈনিক পূর্বদেশ-এ সাংবাদিক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি পূর্বদেশের সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে অনেক নবীন লেখকের লেখা প্রকাশ করেছেন। ১৯৭৬ সালে হেলাল হাফিজ ‘দৈনিক দেশ’ পত্রিকায় সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে নতুন দায়িত্ব পালন শুরু করেন।

অনেক পুরস্কারও পেয়েছেন তিনি। যার মধ্যে অন্যতম—যশোর সাহিত্য পুরস্কার, নেত্রকোনা সাহিত্য পরিষদের পক্ষ থেকে কবি খালেকদাদ চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কার, আবুল মনসুর আহমদ সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার।

‘দিব্য প্রকাশ’ থেকে প্রকাশিত হয়েছিল হেলাল হাফিজের কবিতার বই ‘যে জলে আগুন জ্বলে’। জিটিভি’র ‘শিল্পবাড়ি’ অনুষ্ঠানের এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, দিব্য প্রকাশ নিয়মিত কবিকে বই বিক্রির টাকা বুঝিয়ে দিতেন এবং অনেক টাকাই পেতেন।

হেলাল হাফিজ ২০২৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে গ্লুকোমায় আক্রান্ত ছিলেন। ঢাকার শাহবাগের একটি হোস্টেলে বসবাস করতেন। সেই হোস্টেলের বাথরুমেই তিনি পড়ে যান। প্রায় ৩০ মিনিট অতিবাহিত হওয়ার পরে বাথরুমে তার সাড়াশব্দ না পাওয়ায় হোস্টেলের নিরাপত্তাকর্মীদের সহায়তায় বাথরুমের দরজা ভেঙ্গে অচেতন অবস্থায় তাকে উদ্ধার করা হয়। চিকিৎসার জন্য তাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানকার চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

কবি হেলাল হাফিজ আজ নেই কিন্তু বাংলা কবিতার সংসারে তিনি বেঁচে থাকবেন আজীবন।

লেখক—এম.টি.আই স্বপন মাহমুদ
প্রতিষ্ঠাতা ও প্রকাশক
সংবাদ দিনরাত ও আলোকিত বগুড়া

Facebook Comments Box

Posted ৪:৫৯ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০২৪

Alokito Bogura |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

এ বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০
১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭৩০৩১

উপদেষ্টা সম্পাদক
শহিদুল ইসলাম সাগর
চেয়ারম্যান, বিটিইএ

প্রতিষ্ঠাতা ও প্রকাশক
এম.টি.আই স্বপন মাহমুদ

বার্তা, ফিচার ও বিজ্ঞাপন:
+৮৮০ ১৭৫০ ৯১১ ৮৪৫
ইমেইল: alokitobogura@gmail.com

বাংলাদেশ অনলাইন নিউজ পোর্টাল এসোসিয়েশন কর্তৃক নিবন্ধিত।
তথ্য মন্ত্রণালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত।
error: Content is protected !!