সুবিচারের আশায় থানায় যাওয়া এখন যেন ওসির জন্য তুরুপের তাস। বগুড়ার সোনাতলা থানার ওসি মিলাদুন্নবীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বাদীর কাছ থেকে মামলা শক্তিশালী করার নামে অর্থ নেওয়া এবং একই মামলার বিবাদীর কাছ থেকে আরও বেশি টাকা নিয়ে সেটিকে দুর্বল করে দেওয়ার প্রবণতা। অনেক সময় বাদীর উপর হুমকি ধমকি এবং জোরপূর্বক মীমাংসার চাপ সৃষ্টি করার ঘটনাও প্রায়ই শোনা যাচ্ছে। যেন থানায় বসে বিচারকের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, থানায় অভিযোগ জানাতে গেলেই হয়রানির শিকার হতে হয়। মামলা নিতে গড়িমসি, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য এবং অনৈতিক লেনদেন এখন সবার কাছে ওপেন সিক্রেট।
অনেক ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, থানায় গেলে প্রথমেই দালালের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া হয় এবং টাকা না দিলে অভিযোগের কপি পর্যন্ত হাতে আসে না। এমনকি এজাহারের বিষয়বস্তু পরিবর্তন করে ফেলার অভিযোগও রয়েছে। বিশেষ করে প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে তা গুরুত্বই পায় না, বরং বাদীর উপর ভয়ভীতি সৃষ্টি করে সমঝোতায় বাধ্য করার চেষ্টা চলে। এসব অনিয়মের মূল হোতা হিসেবে ওসি মিলাদুন্নবী এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী এসআই মামুন ও এসআই শামিম রেজার নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, বিবাদীর পক্ষ নেওয়াই যেন সোনাতলা থানার ওসির প্রধান দায়িত্বে পরিণত হয়েছে।
প্রায় ১৪ বছর ধরে বগুড়ার বিভিন্ন থানায় দায়িত্ব পালন করছেন মিলাদুন্নবী। অল্প সময়ের জন্য অন্য জেলায় বদলি হলেও প্রভাবশালী যোগাযোগের কারণে আবারও বগুড়ায় ফিরে আসেন। আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগের পর থেকেই বিএনপি নেতাকর্মীদের দমন এবং আন্দোলন প্রতিরোধে তিনি কঠোর ভূমিকা পালন করেছেন। দিনের ভোট রাতে করা থেকে শুরু করে নির্বাচনী অনিয়মের ক্ষেত্রেও তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক। বগুড়া শহরের নিশিন্দারায় কোটি টাকার পাঁচতলা ফাউন্ডেশনের বিশাল ভবন নির্মাণাধীন। এছাড়া তার মালিকানায় রয়েছে একাধিক প্রাইভেটকার ও জমি, যা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা রয়েছে।
সোনাতলা থানায় যোগদানের পর তার আচরণে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। তাকে ঘিরে ‘গ্রেফতার বাণিজ্য’ এবং আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতাকে ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। আলোচিত একটি ঘটনায় উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি সাহজাহান আলী খন্দকারকে বাসা থেকে গ্রেফতার করে পাঁচ লাখ টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় এক মহিলা নিহত হলে ঘাতকসহ যানটি থানায় আনা হয়, কিন্তু মোটা অংকের বিনিময়ে দফারফা করে ঘাতক ও মোটরসাইকেল ছেড়ে দেওয়ার ঘটনাও এলাকাজুড়ে আলোচনায়।
ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতাও ভয়াবহ। হরিখালি এলাকার চন্দন নামের এক ব্যক্তি বলেন জমিজমা সংক্রান্ত একটি কলহে থানায় অভিযোগ দিলে, আমার কাছে দের লক্ষ টাকা দাবি করে। পরে দড় কষাকশির এক পর্যায়ে ১০ হাজার টাকা অগ্রীম নেন ওসি মিলাদুন্নবী। কিন্তু পরে প্রতিপক্ষের কাছে থেকে আরো বেশি অংকের অর্থ নিয়ে আমার হাত-পা ভেঙ্গে দেয়াসহ নানা ধরনের ভয় ভীতি দেখাতে শুরু করে। আমি উপায়হীন হয়ে বগুড়া পুলিশ সুপার বরাবর অভিযোগ দায়ের করলে আমাকে ১০ হাজার টাকা ফিরে দেয়। কিন্তু চরম নিরাপত্তা হীনতায় ভূগতে থাকি কারন ওসির ভুমীকায় কথা না বলে একজন গুন্ডার ভুমিকায় কথা বলতে থাকে আমার সাথে। এখনো আমাকে প্রায়ই ফোন করে মোটা অংকের টাকা আনতে বলে। টাকা না দিলে আমি নাকি বাঁচতেই পারবোনা।
শিচার পাড়া গ্রামের ৫ম শ্রেণী পড়ুয়া ছাত্রী (ছদ্ম নাম জাহানারা), পিতার নাম- আজগর, তার বাবার চাচাতো ভাইয়ের মেয়ে জলি জাহানারাকে ফুসলিয়ে গোবিন্দগঞ্জ কোন এক ক্লিনিকে চাকরী দেওয়ার নাম করে ডেকে নিয়ে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দেয়। মেয়ের ভাষ্যমতে, বয়স্ক মানুষের সাথে বিয়ের নামে বিক্রি করে দেয়। তারা কয়েকজন পুরুষ ওই মেয়েকে প্রায় দশদিন আটকে রেখে অমানবিকভাবে পাশবিক নির্যাতন করে। পরে কোনভাবে মেয়ে বাড়িতে আসলে এলাকার লোকজন তাকে নিরাপদ আশ্রয় দেয়। পরের দিন ১৭ ডিসেম্বর ২০২৪ ওই রাতে মেয়ে থানায় গেলে ওসি মিলাদুন্নবী কোন অভিযোগ নেয়নি। বরং বলেছে, বিয়ে হয়েছে তার কিসের অভিযোগ। অপরদিকে জলির বাবা বলে জাহানারাকে আমরা কেউ বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করিনি। কিন্তু জলি বলে রংপুরের দিকে বিয়ের কথা বলছিলাম। আর ওসি সাহেব বললেন, কুড়িগ্রামে বিয়ে দিয়েছিল। এখানে ভিকটিম, তার চাচা ও চাচাতো বোনের কথার সাথে ওসির কথার মিল নেই। এমনকি তিনি ভিকটিমের অভিযোগ গ্রহণ করেনি। বরং থানা থেকে ভিকটিম কে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
সাতবেকী গ্রামের শিহাব তার মাকে মারধরের অভিযোগ দিতে গেলে ২০ হাজার টাকা দাবী করেন মিলাদুন্নবী, এছাড়া দলীয় ছেলেদেরকে আরোও ২০ হাজার টাকা দেয়া লাগবে বলে জানায় সে। শিহাব বলেন, অভিযোগ করতে গিয়ে আজ আমি চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। তিনি আরোও বলেন পুলিশের আচরণ এমন হয় আমার জানা ছিলনা।
এদিকে পুলিশের একাংশের বিরুদ্ধে মাদকের আসামিদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। সাধারণ মানুষ বলছেন, সঠিক বিচার পাওয়ার জায়গা যদি হয়রানির কেন্দ্রে পরিণত হয়, তাহলে কোথায় যাবে তারা? প্রায় অর্ধশত ভুক্তভোগীর অভিযোগ রয়েছে এই প্রতিবেদকের কাছে।
ওসি মিলাদুন্নবীর এধরনের নানা কর্মকান্ডের কথা জানতে চাইলে বগুড়া পুলিশ সুপার জেদান আল মুসা বলেন, এ ধরনের কিছু অভিযোগ আমরা ইতিমধ্যে পেয়েছি। বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে, এছাড়া বিভাগীয় কমিশনার স্যারকেও জানানো হয়েছে।
এলাকাজুড়ে এখন আলোচনা সোনাতলা থানার আইনশৃঙ্খলা নয়, বরং অনিয়মের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে থানার ওসি মিলাদুন্নবী।
Posted ৪:৫৮ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ৩১ জুলাই ২০২৫
Alokito Bogura | Editor & Publisher