শনিবার ২রা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৯শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম
শিরোনাম

২০০ বছরের মৃৎশিল্পদের শেষ ভরসা দইয়ের শরাই আর মাটির পাট

আব্দুর রাজ্জাক, সোনাতলা (বগুড়া) প্রতিনিধি   শনিবার, ১৬ নভেম্বর ২০২৪
707 বার পঠিত
২০০ বছরের মৃৎশিল্পদের শেষ ভরসা দইয়ের শরাই আর মাটির পাট

বগুড়া জেলার বিভিন্ন গ্রামে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে মৃৎশিল্পীদের বাস। তার মধ্যে সোনাতলা উপজেলার বালুয়া ইউনিয়নের বামুনিয়া পালপাড়া গ্রামে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ পরিবার মৃৎশিল্পী মাটির জিনিসপত্র তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করেন।

এ এলাকার থেকে তৈরিকৃত মৃৎশিল্পের মনকাড়া পণ্যগুলো দেশের বিভিন্ন স্থানে জায়গা করে নিয়েছিল একসময়। কিন্তু কালের বিবর্তনে এ শিল্প আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। কোন একসময়ে এ শিল্পের জাদুঘরে হয়ত এর স্থান হবে । সে সময় আর বেশি দূরে নয়!


পূর্বপুরুষদের এ পেশাটিকে টিকিয়ে রাখতে প্রতিনিয়ত চলছে মৃৎশিল্পীদের জীবনসংগ্রাম। মাটির পাট, রিং দইয়ের শরাই তৈরি করে সংসারের হাল ধরে রেখেছেন গ্রামীণ নারীরা । কিন্তু মৃৎশিল্পকে ধরে রাখতে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছে কারিগরদের। এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে স্বল্প কিংবা বিনা সুদে ঋণ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন এ পেশার সঙ্গে জড়িত মৃৎশিল্পীরা।

এক সময় বেশ কদর ছিল মাটির তৈরি জিনিসপত্রের কিন্তু বর্তমানে দস্তা, অ্যালুমিনিয়াম এবং প্লাস্টিক থেকে তৈরি জিনিসপত্রের সঙ্গে টিকে থাকতে পারছে না মৃৎশিল্প। অন্য দিকে জিনিসপত্র তৈরি করতে মাটির সংকটে পড়তে হচ্ছে। সে কারণে এ পেশার সঙ্গে জড়িতদের জীবন-যাপন হয়ে পড়েছে কষ্টসাধ্য।


প্রবীণ ব্যক্তি নিত্যনন্দন পাল বলেন, আমাদের বাপ দাদা ১৪পুরুশ প্রায় ২৫০/৩০০ বছর ধরে এ ব্যবসার সাথে জড়িত। মাটির তৈরি পাটগুলো কুয়া বা ইন্দ্রা বানাতো এখন টিউবওয়েল হয়ে আর প্রয়োজন পড়েনা। তবে এখন বাড়ি বাড়ি পায়খানা তৈরির জন্য পাগুলো ব্যবহার করছে এছাড়াও দইয়ের বাটি, শরাই , গ্লাস বর্তমানে চালু আছে। অন্যান্য হাঁড়ি পাতিল বিভিন্ন ধরনের মাটির তৈরি জিনিসপত্র আর চলেনা।

আমরা এক সময় মাটির হাড়ির ভাত খেয়েছি সে সময় ভাতের স্বাদ ও ছিলো আলাদা। মানুষ এখন স্বাচ্ছন্দ আর বিলাসিতা পছন্দ করেন। দেশ আধুনিক যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলার সাথে সাথে ইলেকট্রিক রাইস কুকার গ্যাসের চুলা সিসার পাতিলে রান্না করা খাবার খেয়ে গ্যাস্ট্রিক সহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। মাটির তৈরি জিনিসপত্র গুলো হারিয়ে যাচ্ছে।


পালপাড়ায় মাটির হাড়ি আগের মতো তেমন একটা চোখে পড়ে না। এছাড়া মৃৎশিল্প তৈরির উপকরণ মাটির সংকট, জ্বালানির দাম বেশি হওয়ায় এর দামও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে, মাটির তৈরি জিনিসপত্রের চাহিদাও কমে গেছে।

সোনাতলা উপজেলার বামুনিয়া পালপাড়া গ্রামে দেখা যায়, প্রায় শতাধিক নারী ও পুরুষ মাটির দইয়ের হাড়ি ও রিং তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। কেউ মাটিকে নরম করছেন, কেউ হাঁড়ির ডাকনার আকার দিচ্ছেন আবার কেউ আগুনে পোড়াচ্ছেন। কেউবা বিক্রির উদ্দেশ্যে ভ্যানে মালামাল তুলছে। এভাবেই বিশাল এক কর্মযজ্ঞ চলতে দেখা যায় সেখানে।

উপজেলার বালুয়া ইউনিয়নের বামুনিয়া পালপাড়া গ্রামের শ্রী গনেশ পাল ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, মাটির তৈরি জিনিসপত্রের চাহিদা কমেছে বলে গ্রামের নারীরা এখন দইয়ের হাড়ি তৈরি করে রোজগার করছেন। দইয়ের হাড়ি ছাড়া আমাদের আর কোনো কাজ নেই তেমন একটা। তিনি বলেন, বিভিন্ন স্থান থেকে আঁঠালো মাটি কিনে আমরা এ কাজগুলো করি তবে আমাদের যদি সরকারিভাবে সুদমুক্ত ঋণ দেওয়া হয়, তাহলে এ ব্যবসাটাকে আরো বড় করা যেতো।

বৃদ্ধ মিনতি বালা বলেন, আমাদের ৮সদস্য পরিবার এ কাজের মাধ্যমে আমাদের সংসার চলে। আগে আরও নানা রকম জিনিসপত্র তৈরি করছিলাম এখন সেগুলো আর চলে না। দইয়ের হাড়ি আর ঢাকনা বানানোর মাধ্যমে যা রোজগার হয়, সেটা দিয়ে অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে কষ্টে দিন পার হচ্ছে। বড় ছেলেটা মারা গেছে নাতিকে পড়াশোনার খরচ চালাই। এখন কাজের মাটির দামসহ সব জিনিসপত্রের দাম বেরে গেছে কোনমতে দিন পার হয়।

শ্রী রিপন পাল বলেন, প্রতিটি দইয়ের বাটি,সরা সাইজ অনুযায়ী ৬ হাজার ৮ আট হাজার এবং ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়ে থাকে। মাটির পাট এক সময় সব ধরনের মাটির জিনিসপত্র তৈরি হতো কিন্তু এখন দইয়ের হাড়িই আর মাটির পাট একমাত্র ভরসা!

তপন কুমার বলেন, মৃৎশিল্পের জন্য নদীর আঁঠালো মাটির দরকার হয়। সারাবছরই এ কাজ করা হয় তবে বর্ষা মৌসুমে এ মাটি সংগ্রহ করা ব্যয়বহুল এবং কষ্টসাধ্য। সারাবছর কাজ করার জন্য চৈত্র ও বৈশাখ মাসে মাটি কিনে সংগ্রহ করতে হয়। হাড়ি, ঢাকনা, কাঁসা, পেয়ালা, মাইসা, সাতখোলা, ব্যাংক, কলস, ডাবর, পানি রাখার পাত্রসহ বিভিন্ন জিনিস তৈরি করা হতো এখানে এখন শুধু মাটির পাট রিং দইয়ের শরাই বাটি গ্লাস তৈরি হয়। এগুলোর তেমন একটা চাহিদা না থাকলেও দইয়ের হাড়ির বেশ চাহিদা রয়েছে।

Facebook Comments Box

Posted ১২:১৮ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ১৬ নভেম্বর ২০২৪

Alokito Bogura |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

এ বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০
১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭৩০৩১

উপদেষ্টা সম্পাদক
শহিদুল ইসলাম সাগর
চেয়ারম্যান, বিটিইএ

প্রতিষ্ঠাতা ও প্রকাশক
এম.টি.আই স্বপন মাহমুদ

বার্তা, ফিচার ও বিজ্ঞাপন:
+৮৮০ ১৭৫০ ৯১১ ৮৪৫
ইমেইল: alokitobogura@gmail.com

বাংলাদেশ অনলাইন নিউজ পোর্টাল এসোসিয়েশন কর্তৃক নিবন্ধিত।
তথ্য মন্ত্রণালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত।
error: Content is protected !!