বগুড়ার শিবগঞ্জ বিরল একটি উপজেলা। এ উপজেলায় বেশিরভাগ মানুষ কৃষিনির্ভরশীল। উপজেলার এসব সহজ সরল মানুষদের ভুলভাল ভুঝিয়ে এক শ্রেণির লোক ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নামে প্রতারণার ফাঁদ ফেলেছে।
শিবগঞ্জ উপজেলায় ব্যাঙের ছাতার মত গড়ে উঠেছে প্রায় ৩০টির মত ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এর মধ্যে শুধু শিবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পাশেই প্রায় ১৭টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার। স্বাস্থ্য কর্মকর্তার নাকের ডগায় মানহীন এসব ডায়াগনস্টিক সেন্টার নিয়ে নানান প্রশ্ন সাধারণ মানুষের।
সরকারি নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে শিবগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ডায়াগনস্টিক সেন্টার খুলে অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে এক শ্রেণির অসাধু প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। এসব এলাকায় গড়ে উঠা ছোটবড় ৩০টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার যাদের ভিতর বেশকিছু নাম উঠে এসেছে যে এসব ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিচালক বা মালিকরা চিকিৎসা সেবার নামে দরিদ্র, সহজ সরল মানুষগুলোকে জিম্মি করে হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অংকের টাকা।
তথাকথিত চিকিৎসার নামে ভুল চিকিৎসায় বাঁচানোর চেয়ে মৃত্যুর কিনারায় ফেলা হচ্ছে অসহায় গরীব রোগীদের। এমনই এক ঘটনার জন্ম দিয়েছে শিবগঞ্জ “ডক্টরস ল্যাব এ্যান্ড তাওসিফ কনসলটেশন ডায়াগনষ্টিক সেন্টার”।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, শিবগঞ্জ উপজেলা আটমূল ইউনিয়নের কুড়াহার দামপাড়া গ্রামের ইব্রাহিম হোসেনের স্ত্রী শিউলী খাতুন নামের এক নারীর শরীরের কোমড়ের মেরুদণ্ডের হাড় ব্যথাসহ দেহে বেশকিছু অসুখে আক্রান্ত হয়। অসুস্থ মা কে চিকিৎসার জন্য (২৪ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টায়, ডাক্তার দেখাতে শিবগঞ্জ নিয়ে আসেন ছেলে আরিয়ান সিয়াম। এসময় শিবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে অবস্থিত “ডক্টরস ল্যাব এ্যান্ড তাওসিফ কনসলটেশন ডায়োগনষ্টিক সেন্টার নামক একটি স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠানের সামনে ওঁৎ পেতে থাকা ডক্টরস ল্যাব এ্যান্ড তাওসিফ কনসলটেশন ডায়াগনষ্টিক সেন্টার” এর লোকজনেরা ভাল চিকিৎসা সেবা দেওয়ার নাম করে ভিতরে নিয়ে যান। এরপর ডক্টরস ল্যাব এ্যান্ড ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের পরিচালক ডাক্তার জুয়েল রহমান আরিয়ান রহমান সিয়ামের মা কে নিয়মবহির্ভূত একটি ইনজেকশন পুশ করে অন্যান্য চিকিৎসা প্রদান করেন। এর কিছুক্ষণ অতি বাহিত হলে তার মা সুস্থতার চেয়ে আরও বেশি গুরুত্বর অসুস্থ হয়ে পড়ে। অতঃপর উক্ত ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের চিকিৎসকের চিকিৎসা পত্র অন্যান্য ডাক্তারদেরকে দেখালে তারা জানান, যে তার মা’কে ভুল চিকিৎসা প্রদান করা হয়েছে। বিষয়টি শুনে তাৎক্ষনাৎ ডক্টরস ল্যাব এ্যান্ড তাওসিফ কনসলটেশন সেন্টারে গেলে ডাক্তার সহ অজ্ঞাতনামা নার্সগণ বিভিন্ন রকমের তালবাহানা মূলক কথাবার্তা বলতে থাকে। একপর্যায়ে ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের ভুল চিকিৎসা প্রদানকৃত ডাক্তার জুয়েল তাকে ১হাজার টাকা দিয়ে বিভিন্ন রকমের ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন। এসময় তার মায়ের অসুস্থ বেশী হওয়ায় সে তার মাকে বাঁচাতে দ্রুত শিবগঞ্জ ত্যাগ করে উন্নতি চিকিৎসার জন্য বগুড়া শহরতলীতে যান। সেখানেও তার মায়ের অবস্থার অবনতি হলে তিনি শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের নিকট একটি অভিযোগ দায়ের করেন। পরে স্থানীয় ভাবে বিষয়টি মিমাংসা করার তৎপরতা চলে।
কিন্তু এতে ওই ডক্টরস ল্যাব এ্যান্ড তাওসিফ কনসলটেশন ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের পরিচালক ডাক্তার জুয়েল এর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ হয়নি বলে রোগীর ছেলে আরিয়ান সিয়াম ও স্বজনেরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে চিকিৎসার ভুল স্বীকার করে ডক্টরস ল্যাব এ্যান্ড তাওসিফ কনসলটেশন ডায়াগনষ্টিক সেন্টার এর মালিক ডাক্তার জুয়েল বলেন, গ্যাসের ট্যাবলেট খেয়েও রোগী অসুস্থ হয়ে পড়েন। এটি স্বাভাবিক বিষয়।
একজন ডায়াগনস্টিক পরিচালক হয়ে রোগী দেখা বা ঔষধ লেখার সার্টিফিকেট আপনার আছে কি জানতে চাইলে তিনি আলোকিত বগুড়াকে বলেন, আমি ম্যাক্স হেলথ কেয়ার থেকে সাড়ে ৪ বছর কোর্স করে সার্টিফিকেট নিয়েছি। রোগী দেখা ও ঔষধ লেখার ক্ষমতা ছিল। কিন্তু নতুন আইনে এ কোর্সের সার্টিফিকেটে এখন আর ঔষধ লেখা বা রোগী দেখা সরকার বিধিনিষেধ করেছেন ৷ কিন্তু আপনি তাহলে চিকিৎসা দিলেন কেন? এ বিষয়ে তিনি সদুত্তর দিতে পারেননি।
এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায়, চিকিৎসা না জেনে একটি ভুল চিকিৎসা করা মানে মানুষ হ*ত্যা করা। আর শিবগঞ্জের মত জায়গায় চমকপ্রদ চিকিৎসা সেবার সাইনবোর্ড লাগিয়ে যারা মানুষ হ*ত্যা ব্যবসা করেন, তাদের ঠেকাবে কে? কেনই বা প্রশাসন জেনেও নিশ্চুপ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ডায়াগনস্টিক সেন্টার মালিকরা উপর মহলকে খুশি রেখে ডাক্তার-লাইসেন্স নবায়ন ছাড়াই তাদের রমরমা চিকিৎসা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে অনেক ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স মেয়াদোত্তীর্ণ হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান তেমন কোনো পদক্ষেপ না থাকায় চিকিৎসা সেবার নামে কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী সেবার নামে মানুষ ঠকানোর ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। অনেকের মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্স এবং অদক্ষ টেকনিশিয়ান দিয়ে চলছে এসব ভুয়া প্রতিষ্ঠান। অধিকাংশ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নেই ভালমানের ডাক্তার।
আলোকিত বগুড়ার অনুসন্ধানে জানা যায়, তাদের নেই স্বাস্থ্য বিভাগের লাইসেন্স, শ্রম অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র। প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগ নীরব থাকায় ডায়াগনস্টিক সেন্টার মালিকরা দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে। স্বাস্থ্য সেবার নামে শিবগঞ্জে বেশকিছু ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চলছে এক প্রতারণার ফাঁদ। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য বিভাগ সম্পুর্ন উদাসীন।
আরও জানা যায়, একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিচালনার ক্ষেত্রে হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন/আয়কর প্রত্যয়নপত্র, ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন নম্বর, পরিবেশ অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস, শ্রম অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, নারকোটিক পারমিট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চুক্তিপত্রসহ বেশ কিছু কাগজপত্র ও অবকাঠামোগত বিষয় থাকতে হয়। এছাড়াও একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরিচালনার ক্ষেত্রে ১জন টেকনোলজিস্ট ও ২জন টেকনিশিয়ান থাকার বাধ্যবাধকতা থাকলেও এসব উপজেলার বেশির ভাগ অনেকেরই তা নেই। শুধুমাত্র একটি ঘর ভাড়া নিয়ে সাইনবোর্ড লাগিয়ে অদক্ষ কিছু লোকজন বসিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অংকের টাকা।
শিবগঞ্জ ডক্টরস ল্যাব এ্যান্ড তাওসিফ কনসলটেশন এর ভুল চিকিৎসায় রোগীর দুর্দশার বিষয়ে শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সাথে কথা বললে তিনি আলোকিত বগুড়াকে বলেন, এ বিষয়ে আমি এবং শিবগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শাহীনুজ্জান শাহীন অবগত রয়েছি ৷ ওই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে ৷ যারা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা মানবে না তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। শিবগঞ্জে এসব ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করার জন্য তালিকা তৈরি করেছি। ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে গিয়ে সাধারণ মানুষ যাতে হয়রানির স্বীকার না হয়, সে বিষয়ে মনিটরিং করা হচ্ছে।
Posted ৭:০৩ অপরাহ্ণ | শুক্রবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫
Alokito Bogura | Editor & Publisher