রবিবার ২৫শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ১২ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম
শিরোনাম

শিবগঞ্জে দিন দিন রূপ ও যৌবন হারাচ্ছে করতোয়া নাগর ও গাংনাই

সাজু মিয়া আলোকিত বগুড়া   বৃহস্পতিবার, ২৫ জানুয়ারি ২০২৪
48 বার পঠিত
শিবগঞ্জে দিন দিন রূপ ও যৌবন হারাচ্ছে করতোয়া নাগর ও গাংনাই

বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার বুক চিরে আকাঁবাঁকা পথে বয়ে চলা এক সময়ের ভরা যৌবনা  স্রোতোস্বীনি নদী করতোয়া, নাগর ও গাংনাই। অনেক বাস্তবসঙ্গত কারণে এসব নদী ক্রমশ হারাচ্ছে তাদের রূপ ও যৌবন।

নদীসমূহ থেকে অবৈধভাবে মাটি কেটে নেওয়া, বালু উত্তোলন করা, নদীর জায়গা দখল করে চাষাবাদ করা, নদীর পানি আটকিয়ে মাছ চাষ করা ও নাব্যতা সংকটের কারণে নদীর গতিপথ ও পানি প্রবাহ কমে যাওয়ায় অনেকটা মরা নদীতে পরিনত হওয়ার উপক্রম হয়েছে এসব নদী।


নদী সমূহে পানি না থাকায় পৌষের প্রথম থেকেই স্থানীয় কৃষকদের বোরো ধানের বীজতলা, আগাম ধান চাষ, কলা চাষ ও আলু চাষে আগ্রহী করে তুলেছে এসব নদী। নদী সমূহে পানি না থাকায় বিলিন হয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও পতঙ্গ।

সারা উপজেলার নদী সমূহের অবস্থা, গতিপথ ও পানির স্তর দেখে স্থানীয়রা জানিয়েছে, নদীর আকাঁবাঁকা আঁকার আকৃতি অনেক জায়গায় খুঁজে পাওয়া দুঃস্কর। এসব নদীর প্রায় ৩০ভাগ দখলদারিত্ব ও ৪০ভাগ খননের অভাবে নাব্যতা হারিয়েছে। এ যেন এক বেদনা বিধূর কাহিনী। চৈত্র মাস আসার আগেই করতোয়া, নাগর ও গাংনাই নদী তাদের চিরায়িত যৌবন হারিয়ে পানি শূন্যতায় ভুগছে। নদীর জন্য প্রবাহিত যতটুকু পানি থাকা প্রয়োজন ছিলো তার ২৫ ভাগও নেই এসব নদীতে। যতটুকু পানি আছে তা একটি নালার মতো বয়ে চলা খাল বিশেষ।


শিবগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের তথ্য মতে, হিমালয় পর্বতের পাদদেশে নেপালের পর্বতমালা হতে করতোয়ার উৎপত্তি। অতঃপর গাইবান্ধা জেলার মধ্য দিয়ে গোবিন্দগঞ্জ অতিক্রম করে। এ নদীকে অবশ্য ব্রহ্মপুত্রের উপনদী বলা হয়।

বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ থানার ময়দানহাটা ইউনিয়নস্থ পলাশী মৌজার পশ্চিম প্রান্ত দিয়ে প্রবেশ করে কালাই-শিবগঞ্জ থানা সীমানা বরাবর প্রায় ২ মাইল প্রবাহিত হয়ে কচুয়া মৌজার পশ্চিম দিকে একটি বাঁক নিয়ে গোটিলা, উত্তর কৃষ্ণপুর, চান্দার, কিচক ইউনিয়নস্থ পাতাইর মৌজায় পৌঁছে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যায়। ১টি শাখা পাতাইর এ বাঁক নিয়ে উত্তর দিকে কিছুদূর অগ্রসর হয়ে মাদারগাছি পার হয়ে সোজা মাটিয়ানে পড়ে। ২য় শাখাটি সোজা দক্ষিণে অগ্রসর হয়ে মাটিয়ান, গোপীনাথপুর, আটমূল ইউনিয়নের চককানু, শিবগঞ্জ ইউনিয়নের চক গোপাল, বিহার ইউনিয়নের নাটমরিচায় এসে এটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। প্রথম শাখা বগুড়া-গাইবান্ধা সড়ক অতিক্রম পূর্বক আঁকাবাঁকা পথে অগ্রসর হয়ে যথাক্রমে রায়নগর ইউনিয়নের তেঘড়ি, আচলাইতে এসে আবার দ্বিধাবিভক্ত হয় যার প্রথমটি মোকামতলা ইউনিয়নের ভাগকোলা, আঁচলাই, আরজী পার আঁচলাই, মুরদাপুর দিয়ে গাইবান্ধা বগুড়া সড়ক অতিক্রম পূর্বক সোনাতলা থানায় প্রবেশ করে, আর দ্বিতীয় শাখা আঁচলাই, পার-আঁচলাই আলোকদিয়া, রায়নগর ইউনিয়নের করতকোলা, অনন্তবালা হয়ে বগুড়া-গাইবান্ধা সড়ক অতিক্রম পূর্বক নগরকান্দিতে ৩/৪টি বাঁক নিয়ে বগুড়া সদরে প্রবেশ করে।


অপর দিকে শিবগঞ্জ থানার উত্তর পশ্চিমস্থ মৌজা ময়দানহাট্টা ইউনিয়নের পলাশী থেকে বেরিয়ে জয়পুরহাটের কালাই থানা-শিবগঞ্জ থানা সীমানা বরাবর মাইল তিনেক অগ্রসর হয়ে গোতিলা নামক স্থানে পূর্ব দিকে ২/৩ টি বাঁক নিয়ে উত্তর কৃষ্ণপুর, চান্দার হয়ে কিচক ইউনিয়নের পাতাইর, জয়পুরহাট কিচক রাস্তার মোড় নিয়ে চককানু, চক গোপাল, নাটমরিচাই হয়ে বানাইলের নিকট করতোয়ার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এ নদীর দৈর্ঘ্য ১০/১২ মাইল। গাংনাই নদীতে সব ঋতুতে পানি থাকে না।

এছাড়াও করতোয়ার শাখা নদী নাগর বগুড়া জেলার অন্যতম নদী। এটি বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ থানার আটমূল ইউনিয়নস্থ জগদীশের নিকট করতোয়া থেকে বের হয়ে প্রায় ১০ মাইল বগুড়া ও জয়পুরহাট জেলা সীমানা বরাবর প্রবাহিত হয়ে দুপচাঁচিয়া থানায় প্রবেশ করে। নদীটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৭৫ মাইল। নদীটি খুবই সর্পিল প্রকৃতির এবং বর্ষাকলে বেশ পানি থাকে।

এক সময়কার পাট ব্যবসায়ী আবু জাফর মন্ডল আলোকিত বগুড়া’কে বলেন, বেশিদিন আগের কথা নয় আশির দশকে প্রাণচঞ্চলা এসব নদীর বুক জুড়ে বয়ে চলতো ছলছল পানি। সূর্যের আলোয় চিকিমিকি ঢেউ খেলতো। মাঝিরা কর্মব্যস্ত খেয়া ঘাটে মানুষ পারাপার করতো, জেলেরা মাছ ধরতো। নদীতে নৌকা চলতো এ ঘাট থেকে দূরের কোনো ঘাটে। সেই সময় স্থলপথ আধুনিক না থাকায় এই নদীপথেই বাণিজ্যিক মালামাল ধান, পাটসহ নানা রকমের কৃষি ফসল শিবগঞ্জ, দাড়িদহ, কিচক, উথলী ও মহাস্থান হাটে বেচাকেনার জন্য মানুষ নিয়ে আসতো। লক্ষ্য করলে দেখা যায় শিবগঞ্জের পুরনো বড় হাটগুলো করতোয়া, নাগর ও গাংনাই নদীর কুল ঘেঁষেই অবস্থিত।

নদীগুলোর পাড়ে গিয়ে দেখা যায়, চারদিকে শুধু সবুজ ধানের বীজতলা, ধানের আবাদ ও আলুর খেত চোখে পড়ার মতো। নদীগুলোর গর্ভে যেন লক্ষী ভান্ডারের বিজ ও চারা বপণ করছে স্থানীয় কৃষকেরা। তবে নদী আর পাশের জমিগুলো ভাতৃত্বের বন্ধনের মিলে মিশে একাকার হয়েছে। কৃষকের হাতের স্পর্শে নদী ও নদী পাড়ের জমিতে চোখে পড়ার মতো ফসলের চাষাবাদ করা হয়েছে। নদীর মাঝখান দিয়ে এখন নালার মত করে পানি জমে আছে। কোথাও আবার সামান্য একটু অংশজুড়ে হাঁটু পানি আছে। এই পানির গতিপথ আটকিয়ে করা হচ্ছে মাছ চাষ। উপজেলার নাগরব্রীজ, অর্জুনপুর, আমতলী, দেবীপুর, গুজিয়া, ভাগকোলা, আচলাই, আরাজী পারআচলাই, মুরদাপুর, আলোকদিয়া, করতকোলা, অনন্তবালা, কৃষ্ণপুর, চান্দার, পাতাইর, চককানু, চক গোপাল, নাটমরিচাই, বানাইল, মাটিয়ান, গোপীনাথপুর ও আটমূল এলাকায় গেলে চোখে পড়বে এসব দৃশ্য। হরহামেশা আর দেখা যায় না দলবেঁধে শিশুদের গোসল ও লাফঝাঁপ। একসঙ্গে মিলিত হয়ে ঝাঁক বেঁধে মাছ ধরতে নামেনা মাঝিরা। দেখা যায় না কৃষকদের হাল চাষ করা কাঁদা মাখানো গরু ও মহিষের গোসলের চিত্র। মুছে গেছে কচুরিপানার দল বেঁধে ছুটে চলা। বক, মাছরাঙ্গা কিংবা বেলে হাঁসের ঠোঁটে শোভা পায় না তাজা মাছের ছটফটানি।

কৃষক আমজাদ, শফিকুল, শহিদুল ও আলমগীর বলেন, নদী শুকিয়ে যাওয়ায় এবছর নদীর জায়গায় ধানে চারা রোপণ করেছি। শেষ পর্যন্ত আবহাওয়া ভালো থাকলে ৩-৪ মাসের খোরাক ঘরে তুলতে পারবো। প্রতিবছরই যে আমরা ধান ঘরে তুলতে পারি এমনটা না। যদি আবহাওয়া খারাপ হয় তাহলে নদীর পানিতে ধান ডুবে যায়। তাই আমরা তাড়াতাড়ি করেই এই ধানের চারা নদীতে রোপন করি যেন বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি বা শেষ দিকে ধান কাটতে পারি। জ্যৈষ্ঠ মাসের আশায় থাকলে অনেক সময় ধান ঘরে তোলা যায় না। সেই সময় নদীতে বৃষ্টির পানি চলে আসে। নদীতে উর্বর পলি মাটি থাকার কারণে সার খৈল এর প্রয়োজন হয় না। তবে ভালো ফলনের জন্য নদীতে একেবারে পানি না থাকলে শেলো মেশিন দিয়ে সেচ দিতে হয়। নদীর উপরে যাদের জমি আছে তারাই সাধারণত নদীর জায়গা দখল করে ধান চাষ করে থাকে। সময়ের বির্বতনে ঐতিহ্যবাহী করতোয়া নদী পানিশূন্য হয়ে পড়ায় এলাকার অধিকাংশ কৃষকরা নদীতে বীজতলা তৈরি করে বোরো ধানের চারা উৎপাদনের জন্য ধানের বীজ বপন করে। কৃষকরা এতে উপকৃত হলেও এলাকার জেলে ও মাঝিরা পূর্বপুরুষদের পেশা ছেড়ে অন্যান্য পেশায় জীবিকা নির্বাহ করছে। শুধু বর্ষা মৌসুমে নদীটি পানিতে টইটুম্বুর হয়ে তার ভরা যৌবন ফিরে পায়। চৈত্র মাস আসার আগেই শুকিয়ে মৃতঃ নদীতে পরিণত হয়।

নদী বিশেষজ্ঞরা জানান, হাইকোর্ট নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে কিন্তু তাতে প্রাণ পাঁচ্ছে না নদী। দখল-দূষণের দায়ে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদ- দেওয়ার আইন থাকলেও এখন পর্যন্ত কারও দ- হয়নি। বাংলাদেশ দূর্যোগ ফোরামের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৬৩ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ৩৭ বছরে দেশের ১১৫টি নদ ও নদী শুকিয়ে মৃত প্রায়।

এ বিষয়ে শিবগঞ্জ নির্বাহী কর্মকর্তা তাহমিনা আক্তার আলোকিত বগুড়া’কে বলেন, “বর্তমান সময়ে করতোয়া, নাগর ও গাংনাই নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে নদীগুলো হারাচ্ছে তার রূপ ও যৌবন। দীর্ঘ দিন ধরে নদীতে পলি জমে ভরাট হওয়ার কারণে নাব্যতা হারাচ্ছে নদীগুলো। পানি শুকিয়ে যাওয়ায় এলাকার কৃষকেরা নদীতে ধান বীজ ও ধান ও আলু রোপন করেছে। আমরা ঊর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে নদীগুলো খনন এবং অভিযান পরিচালনা করে দূষণ ও দখলদারিত্ব রোধের কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে”।

সব মিলিয়ে কালের গহ্বরে হারিয়ে গেছে এসব নদীর পুরনো সেই সোনালী অতীত। মুছে গেছে চিরচেনা কলতান সেই রূপ ও যৌবন। আর হয়তো ফিরবেও না নিজের স্বরূপে এ নদীগুলো। এই দায়ভার শুধু প্রকৃতির নয়। আছে আমাদের সকলের অবহেলা ও লোলুপ দৃষ্টি। প্রকৃতি মানুষের উপকারে আসলেও মানুষ বরাবরই প্রকৃতির গলা টিপে আধুনিক হতে গিয়ে পরিবেশ নষ্ট করছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যাচ্ছে ভারসাম্যহীন বাস্তবতা।

Facebook Comments Box

Posted ৫:২৫ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৫ জানুয়ারি ২০২৪

Alokito Bogura || Online Newspaper |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

এ বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯  

উপদেষ্টা:
শহিদুল ইসলাম সাগর
চেয়ারম্যান, বিটিইএ

প্রতিষ্ঠাতা ও প্রকাশক:
এম.টি.আই স্বপন মাহমুদ
বার্তা সম্পাদক: এম.এ রাশেদ
সহ-বার্তা সম্পাদক: মোঃ সাজু মিয়া

বার্তা, ফিচার ও বিজ্ঞাপন যোগাযোগ:
+৮৮০ ১৭ ৫০ ৯১ ১৮ ৪৫
ইমেইল: alokitobogura@gmail.com

বাংলাদেশ অনলাইন নিউজ পোর্টাল এসোসিয়েশন কর্তৃক নিবন্ধিত।
তথ্য মন্ত্রণালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত।
error: Content is protected !!